ইসলামে নারীর অনুপম অধিকার

27

দ্বীনি ও পার্থিব শিক্ষা লাভ করার জন্য নারীকে শুধু অনুমতিই দেওয়া হয়নি; বরং পুরুষের শিক্ষাদীক্ষা যেমন আবশ্যকীয় মনে করা হয়েছে, তাদের শিক্ষাদীক্ষাও তদ্রƒপ আবশ্যকীয় মনে করা হয়েছে। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরজ।’ (ইবনে মাজাহ)

ইসলাম নারীকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়েছে। মর্যাদা দিয়েছে কন্যা, স্ত্রী, মা, খালা, ফুফু এবং সমাজের সদস্যরূপে।
কন্যারূপে নারী : আরব সমাজে কন্যা সন্তান লাভ করা একটা অপমানের ব্যাপার বলে বিবেচিত হতো। নিষ্ঠুর বাবা তাই আপন ঔরসজাত কন্যাকে জীবিত কবর দিয়ে নিষ্কৃতি লাভ করত। রহমতের মূর্ত প্রতীক নবী করিম (সা.) এ নিষ্ঠুর আচরণ বরদাশত করতে পারলেন না। এ ব্যাপারে তিনি আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ কামনা করলেন। ওহি নাজিল হলো, ‘তোমাদের সন্তানদের দরিদ্রতার ভয়ে হত্যা করো না। তাদের আমিই রিজিক দিই এবং তোমাদেরও। নিশ্চয়ই তাদের হত্যা করা মহাপাপ।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ৩১)।
এ নির্দেশ জেনে মোমিনরা চমকে উঠলেন এবং কন্যা হত্যার নির্দয় অভ্যাস চিরতরে বর্জন করলেন। নবী করিম (সা.) নিজেও বাণী প্রদান করলেন, ‘যে ব্যক্তি দুটি কন্যা সন্তানকে লালন-পালন করে সুপ্রতিষ্ঠিত করবে, কেয়ামতের দিন আমি এবং সেই ব্যক্তি হাতের এই দুটি আঙুলের মতো পাশাপাশি থাকব।’ (মুসলিম)। মহানবী (সা.) আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তির কন্যা সন্তান হবে, সে যদি তাকে জীবিত কবর না দেয়, তার প্রতি তাচ্ছিল্যমূলক আচরণ না করে এবং নিজের পুত্র সন্তানকে তার ওপর প্রাধান্য না দেয়, তাহলে আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।’ (আবু দাউদ)।
স্ত্রীর অবস্থানে নারী : ইসলাম-পূর্ব যুগে আরব সমাজে স্ত্রী হিসেবে নারীর কোনো মর্যাদা ছিল না। পুরুষরা খেয়াল-খুশি মতো স্ত্রী গ্রহণ করত, ইচ্ছা মতো তাদের বর্জন করত, তাদের প্রতি যথেচ্ছ ব্যবহার করত। রাসুলে করিম (সা.) তাদের আল্লাহর কালাম শোনালেন, ‘তারা (নারীরা) তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ।’ (সূরা বাকারা : ১৮৭)। ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের সঙ্গিনীদের, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও।’ (সূরা রূম : ২১)। এছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও বাণী প্রদান করলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিরাই উত্তম যারা স্ত্রীদের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করে।’ (তিরমিজি)।
মায়ের অবস্থানে নারী : ইসলাম মা হিসেবে নারীকে যে সম্মান দান করেছে তা অতুলনীয়। রাসুলে করিম (সা.) এর আবির্ভাবের আগে তামাম দুনিয়ার মানুষই বাবাকে মায়ের চেয়ে বেশি সম্মানের পাত্র বলে মনে করত এবং মায়ের ওপর বাবাকে প্রাধান্য দিত। কোরআনের আয়াত নাজিল হলো, ‘আমি তো মানুষকে তার মা-বাবার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। জননী সন্তানকে কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে গর্ভে ধারণ করে এবং তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে।’ (সূরা লোকমান : ১৪)। ‘মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত।’
অর্থনৈতিক অধিকার : ইসলামী শরিয়তের সীমার মধ্য থেকে অর্থনৈতিক ব্যাপারে শ্রম ও সম্পদ বিনিয়োগের অধিকার রয়েছে নারী-পুরুষ উভয়ের। অতএব একজন নারী ঠিক একজন নরের অনুরূপ সম্পদ অর্জনও করতে পারে এবং তার স্বত্বাধিকারীও হতে পারে। সে যে কোনো হালাল পেশা অবলম্বন করতে পারে। আবার সে তার সম্পত্তি সম্পূর্ণ নিজের আয়ত্তে রাখতে পারে এবং নিজের ইচ্ছানুযায়ী ভোগ-ব্যবহার করতে পারে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘মা-বাবা ও আত্মীয়স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষের অংশ আছে এবং মা-বাবা ও আত্মীয়স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীরও অংশ আছে, তা অল্পই হোক অথবা বেশি, এক নির্ধারিত অংশ।’ (সূরা নিসা : ৭)।
বিবাহে নারীর সম্মতি : ইসলামী আইনে বিবাহে নারীর সম্মতি একান্ত প্রয়োজন। ইসলামের বিধান এই যে, নারী বিধবা হোক বা কুমারী হোক, তার সম্মতি ব্যতীত তাকে কেউ বিয়ে দিতে পারে না। খানাসা বিনতে খিজাম আনসারিয়া (রা) কে তার বাবা তার অনুমতি না নিয়ে বিয়ে দিলেন। তিনি মহানবী (সা.) এর কাছে নালিশ করেন। মহানবী এ বিয়ে বাতিল করে দেন (বোখারি)।
এক নারী মহানবী (সা.) এর দরবারে এসে নিবেদন করল, ‘আমার বাবা আমাকে বিয়ে দিয়েছেন এতে আমি সন্তুষ্ট নই।’ মহানবী (সা.) তাকে বললেন, ‘তোমার ইচ্ছা হলে বিয়ে বহাল রাখতে পারো অথবা বাতিল করেও দিতে পারো।’ (ইবন মাজাহ)।
তালাক এবং খুলা এর মাধ্যমে বিচ্ছেদের অধিকার : কোনো দম্পতির যদি পারস্পরিক সহাবস্থান সম্ভব না হয়, তাহলে স্বামী যেরূপ তালাক দিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে, স্ত্রীও তেমনি খুলার মাধ্যমে কোর্টের সহায়তায় বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে সক্ষম। তালাক হচ্ছে স্বামীর পক্ষ থেকে বিবাহ বিচ্ছেদ। অন্যদিকে খুলা হয়ে থাকে স্ত্রীর দাবির ভিত্তিতে। আল্লাহর বাণীÑ ‘যদি তাদের উভয়ের আশঙ্কা হয় যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করে চলতে পারবে না এবং তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করে চলতে পারবে না তবে স্ত্রী কোনো কিছুর বিনিময়ে নিষ্কৃতি পেতে চাইলে তাতে তাদের কারও কোনো অপরাধ নেই।’ (সূরা বাকারা : ২২৯)।
অভিন্ন আইন : ইসলামে নারী-পুরুষের মর্যাদা সমান এবং তাদের জন্য অভিন্ন আইন প্রণীত হয়েছে। কোরআন মজিদ ঘোষণা করেছে, ‘পুরুষ অথবা নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকাজ করলে ও মোমিন হলে তারা জান্নাতে দাখিল হবে এবং তাদের প্রতি অণু পরিমাণও জুলুম করা হবে না।’ (সূরা আন নিসা : ১২৪)।
বিচারের ক্ষেত্রে ইসলামে নারী এবং পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়নি। যদি কোনো মহিলা কোনো পুরুষকে হত্যা করে তাহলে তার জন্য যে শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে, পুরুষের জন্যও একই শাস্তি। রাসুলে করিম (সা.) এর জারিকৃত আইনের একটি হচ্ছে, ‘স্ত্রীলোকের হত্যাকারী কোনো পুরুষ হলে শাস্তিস্বরূপ তাকে হত্যা করা হবে।’ (বায়হাকি)।
নারী শিক্ষা : দ্বীনি ও পার্থিব শিক্ষা লাভ করার জন্য নারীকে শুধু অনুমতিই দেওয়া হয়নি; বরং পুরুষের শিক্ষাদীক্ষা যেমন আবশ্যকীয় মনে করা হয়েছে, তাদের শিক্ষাদীক্ষাও তদ্রƒপ আবশ্যকীয় মনে করা হয়েছে। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরজ।’ (ইবনে মাজাহ)।
কর্মক্ষেত্রে নারী : নারীদের কর্মতৎপরতা শুধু বিদ্যা শিক্ষা, জ্ঞান অর্জন ও চিন্তা-গবেষণা পর্যন্তই নয়। বাস্তব কাজে যথার্থ ভূমিকা পালনের স্বার্থেও ইসলাম এক বিস্তীর্ণ ক্ষেত্র তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে। রাসুলে করিম (সা.) এর সময়কার মুসলিম মহিলাদের কর্মৎপরতা দেখে একথা বলিষ্ঠ কণ্ঠেই বলা যেতে পারে যে, মুসলিম মহিলারা কাজের প্রয়োজনে বাড়ির বাইরেও যেতে পারেন। মহানবী (সা.) উবাদা ইবনে সামেতের স্ত্রী উম্মে হারামকে জিহাদের জন্য সমুদ্রযাত্রার অনুমতি দিয়েছিলেন। এই অনুমতি প্রদান থেকে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি অনুধাবন করা যায়। ইসলাম চায় না যে, সামাজিক ক্রিয়াকা- থেকে নারী দূরে থাকুক।
ইসলাম নারীকে প্রয়োজনে বাইরের কাজে আত্মনিয়োগ করার অনুমতি দিয়েছে। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) এর কন্যাকে তার স্বামী তালাক দেয়। তালাকের পর ইদ্দত চলাকালে তিনি কয়েক কাঁদি খেজুর কেটে বিক্রি করার ইচ্ছা করলে এক ব্যক্তি তাকে নিষেধ করে এই বলে যে, ইদ্দতের মেয়াদে বাইরে যাওয়া জায়েজ নয়। বিষয়টি মহানবী (সা.) এর কাছে উত্থাপন করা হলে তিনি তাঁকে অনুমতি দেন বাগানে গিয়ে খেজুর সংগ্রহ করতে এবং বিক্রি করতে। (আবু দাউদ)।

মন্তব্য করুনঃ