তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল

120

নবীজি (সা.) বলেন, ‘ওই ব্যক্তিকে আল্লাহ রহম করুন, যে রাতে উঠে নামাজ আদায় করে এবং নিজ স্ত্রীকে জাগিয়ে দেয়। স্ত্রী জাগ্রত হতে না চাইলে তার চেহারায় পানির ছিটা দেয়। অনুরূপ আল্লাহ ওই নারীকে দয়া করুন, যে রাতে উঠে নামাজ আদায় করে এবং স্বীয় স্বামীকে জাগ্রত করে দেয়। সে অস্বীকার করলে তার চেহারায় পানির ছিটা দেয়।’ (আবু দাউদ : ১৩১০)

মোমিনদের উজ্জ্বল মর্যাদাময় গুণ এবং আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে নিষ্ঠাবান মুত্তাকিদের মহান বৈশিষ্ট্যÑ যার মাধ্যমে তারা আল্লাহ ও রাসুলের নিদর্শন অস্বীকার ও মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের থেকে আলাদাÑ তা হলো, তাদের রবের দেওয়া সজীব অন্তর, সমুচ্চ আত্মা, সজাগ অনুভূতি, যা তাদের এমন বানায় যে, তারা যখন দেখে আল্লাহ তাদের তাঁর অবতীর্ণ মহাগ্রন্থে মোমিন বিশেষণে সম্বোধন করছেন, যেমনÑ ‘হে ঈমানদাররা!’ (সূরা বাকারা : ১০৪), তারা তখন এই ডাকে সাড়া দেয়Ñ সচেতন কান, ভীত অন্তর ও সতর্ক চিন্তা নিয়ে। কেননা তারা নিশ্চিত যে, সেটি হয় কোনো কল্যাণ যার আদেশ দেওয়া হচ্ছে কিংবা অকল্যাণ যা থেকে বারণ করা হচ্ছে।
আল কোরআনে আহলে ঈমানের উদ্দেশ্যে আল্লাহ রহমানের আদেশগুলোর মধ্যে একটি হলো তাঁর বাণী : ‘হে ঈমানদাররা, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয়, কঠোর স্বভাব ফেরেশতারা। তারা আল্লাহ যা আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং যা করতে আদেশ করা হয়, তাই করে।’ (সূরা তাহরিম : ৬)।
কী গুরুগম্ভীর এ আহ্বান! কতই না গুরুত্বপূর্ণ এর স্পষ্ট বিবৃতি। প্রতিটি মানুষ নিজের এবং আল্লাহ কর্তৃক তার দায়িত্বভুক্ত করা স্ত্রী, সন্তান ও নিকটজনদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল! ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ওই দায়িত্ব যা তার ও তাদের এবং জাহান্নামের মাঝে সুরক্ষা তৈরি করে, যা তাকে ও তাদের কেয়ামতের দিন এর আজাব থেকে রক্ষা করবে।
আল্লাহ প্রতিটি মানুষের কর্মকেÑ সে ভালো করুক আর মন্দÑ তার গ্রীবালগ্ন করে রেখেছেন। সে সেসবই করবে। সেসবেরই প্রতিদান দেওয়া হবে, হিসাব নেওয়া হবে। কেয়ামতের দিন সেসবকেই চোখের সামনে লিপিবদ্ধ আকারে দেখতে পাবে। উপরন্তু সে জিজ্ঞাসিত হবে আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্ব সম্পর্কে। স্ত্রী-সন্তানের অভিভাবকত্ব ও কর্তব্য বিষয়ে। যেমন এ ব্যাপারে সংবাদ দিয়েছেন হেদায়েতের নবী (সা.) নিজ বাণীতে। বোখারি ও মুসলিম তাদের সহিহ গ্রন্থে সংকলন করেন, আবদুল্লাহ বিন আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, ‘সাবধান, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল আর তোমরা প্রত্যেকেই তার অধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। জনগণের আমিরও একজন দায়িত্বশীল, সে তার প্রজাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের লোকদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, সে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন স্ত্রীলোক তার স্বামীর ঘরের দায়িত্বশীল, সে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। গোলাম তার মালিকের ধন-সম্পদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, সে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। শোন, (এভাবে) তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল আর তোমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’
অতএব এটি বড় দায়িত্ব ও মহান আমানত। আল্লাহ বিশ্বাসী, তাঁর সাক্ষাতে আস্থাবান এবং তাঁর প্রতিদান ও হিসাব, নেকি ও শাস্তিকে সত্যজ্ঞানকারী প্রত্যেকের উচিত নিজেকে এবং আল্লাহর দায়িত্ব দেওয়া স্ত্রী, পুত্র, কন্যা ও নিকটজনদের বাঁচাতে কাজ করা। এমন সব কিছু থেকে তাদের রক্ষা করা, যা তাকে ও তাদেরকে কেয়ামতের দিন জাহান্নামে দাখিল করে। তার তাপে দগ্ধ করে। তার শাস্তিতে পতিত করে।
এ সুরক্ষা বাস্তবতা পায় নিজেকে ও স্ত্রী-সন্তানকে আল্লাহ ও রাসুল (সা.) এর আদেশ পালন ও নিষেধ বর্জন করে তাঁদের ডাকে সাড়া দানের মাধ্যমে। এর জন্য সে গ্রহণ করে নিজের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী সহায়ক ও সুস্পষ্ট প্রতিবন্ধক, যা তাকে আল্লাহর আজাব থেকে বাঁচাবে। সেটি প্রথমত, আল্লাহর তাওহিদ এবং একমাত্র তাঁরই ইবাদত। যেমন: দোয়া, নামাজ, রুকু, সিজদা, রোজা, জাকাত, হজ, মানত, জবাই, কসম, ভালোবাসা, ভয়, প্রত্যাশা, ভরসা, তওবা, বিনয়, বিগলন, শ্রদ্ধা ইত্যাদি। এসব এবং আল্লাহর ইবাদত হিসেবে বিধিত সব কিছু একমাত্র তাঁর জন্য তাঁর শরিয়ত ও অনুমতিমাফিক তাঁরই নবীর অনুকরণে সম্পাদন করা।
দ্বিতীয়ত, পরিণতিতে সবচেয়ে গর্হিত, ঘৃণিত ও মারাত্মক গোনাহ তথা শিরক থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে। তা আল্লাহ বৈ অন্য কারও জন্য কোনো ধরনের ইবাদত না করে। কেননা শিরকই সে পাপ, যা থেকে তাওবা না করে মারা গেলে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। যেমন এরশাদ হয়েছে, ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে লোক তাঁর সঙ্গে শরিক করে। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্নপর্যায়ের সব পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। আর যে লোক অংশীদার সাব্যস্ত করল আল্লাহর সঙ্গে, সে যেন অপবাদ আরোপ করল।’ (সূরা নিসা : ৪৮)।
তৃতীয়ত, যাবতীয় গোনাহ ও পাপাচার থেকে তওবা নাসুহের মাধ্যমে। আল্লাহর এমন বাণীর অনুকরণে : ‘মোমিনরা, তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ (সূরা নুর : ৩১)। ‘মোমিনরা! তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করÑ আন্তরিক তওবা।’ (সূরা তাহরিম : ৮)।
তওবা তৎক্ষণ অবধি নাসুহ বা খাঁটি হয় না, যে যাবৎ সে গোনাহ নির্মূল করে, কৃতকর্মে আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হয়, তার পুনরাবৃত্তি না করা সম্পর্কে দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করে এবং বান্দার হক জড়িয়ে থাকলে প্রাপককে তার প্রাপ্য ফেরত দেয়। এ তওবার সঙ্গে যদি যোগ হয় প্রবৃত্তির ব্যাপারে পূর্ণ সতর্কতা ও পর্যবেক্ষণ, ধারাবাহিক চিন্তা-গবেষণাসহ নিজ রবের কিতাব তেলাওয়াত, ফরজ ছাড়াও নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রয়াস, ভুলে গেলে তাকে মনে করিয়ে দেওয়া এবং মনে থাকলে সহযোগিতা করার মতো পুণ্যবান সেরাদের সৎসঙ্গ আর মোমিনদের জন্য শুভ কামনা, তাদের কষ্ট দূর করা এবং সম্ভাব্য সব উপায়ে তাদের সঙ্গে সদাচার, তাহলে সোনায় সোহাগা। যেমন : তাদের হিত কামনা এবং আল্লাহর আদেশে অবাধ্যতা দেখানোর স্পর্ধা ও তাঁকে ক্রোধান্বিত করা থেকে সতর্ক করা। আল্লাহ সুবহানাহু বলেন, ‘অতঃপর যখন আমাকে রাগান্বিত করল তখন আমি তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নিলাম এবং নিমজ্জিত করলামÑ তাদের সবাইকে।’ (সূরা জুখরুফ : ৫৫)।
এসব গুণের সঙ্গে তওবা নাসুহ যুক্ত হলে তা হবে নিজের জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে বিরাট সুরক্ষা। পক্ষান্তরে স্ত্রী, পুত্র, কন্যা ও দায়িত্বাধীন সবার সুরক্ষা হবে সৎ কাজে আদেশ, অসৎ কাজে নিষেধ, শিক্ষা ও উপদেশ প্রদান, শিষ্টাচার শেখানো, নিরীক্ষণ-পর্যবেক্ষণ এবং প্রজ্ঞা ও প্রত্যুৎমতিত্বের সঙ্গে তাদের ও তাদের সঙ্গী-বান্ধবের অবস্থার খোঁজখবর নেওয়ার দ্বারা। নবীজি (সা.) এর ওই পবিত্র দিকনির্দেশনা মাথায় রেখে, যেখানে তিনি সৎ সঙ্গ ও অসৎ সঙ্গের ভূমিকা বুঝিয়ে দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উপমা হলো কস্তুরী বহনকারী (আতর বিক্রেতা) ও কামারের হাপরের মতো। মৃগ-কস্তুরী বহনকারী হয়তো তোমাকে কিছু দান করবে কিংবা তার কাছ থেকে তুমি কিছু খরিদ করবে কিংবা তার কাছ থেকে তুমি লাভ করবে সুবাস। আর কামারের হাপর হয়তো তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে কিংবা তুমি তার কাছ থেকে পাবে দুর্গন্ধ।’
এটি সব সঙ্গী-বন্ধুর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্যÑ চাই সেটি প্রচলিত সরাসরি উপায়ে হোক কিংবা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ইত্যাদির উপায়ে হোক। ব্যাপক প্রসার ও ব্যবহারে আসা আধুনিক সব মাধ্যমই এর অন্তর্ভুক্ত। যার প্রভাব শক্তিশালী ও পরিণাম-পরিণতি ঝুঁকিপূর্ণ। যে অভিভাবক এ ব্যাপারে উদাসীন হবেন, প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন, নিজ রব ও প্রভুর অবাধ্য হবেন এবং দায়িত্বাধীনদের ব্যাপারে অবহেলা করবেন, তার ইহ-পরকাল বরবাদ হয়ে যাবে। অধীনদের সংশোধন ও পথপ্রদর্শনের দায়িত্বের গাফেল বলে গণ্য হবেন।
সন্তানের প্রতি অভিভাবক হিসেবে করণীয় বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা এসেছে হাদিসে।
যেমন : নবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের সন্তানদেরকে নামাজের আদেশ দাও যখন তাদের বয়স সাত বছর হয়। আর দশ বছর বয়স হলে নামাজের জন্য তাদের শাসন কর এবং তাদের পরস্পরের বিছানা আলাদা করে দাও।’ (বর্ণনায় আবু দাউদ)।
অভিভাবক হিসেবে স্ত্রীর প্রতি করণীয় বলে দেওয়া হয়েছে হাদিসে। আপনার কর্তব্য, তাকে চাঁদের ভিত্তিতে নামাজের ওয়াক্ত, রোজার ফরজ, ফিতরার ওয়াজিব জানিয়ে দেওয়া। ইমাম মুসলিম তদীয় সহিহ গ্রন্থে সংকলন করেন, আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) রাতে নামাজ পড়তেন। শেষে বিতরের আগে তিনি আওয়াজ দিতেন, ‘হে আয়েশা, উঠে বিতর পড়।’ ইমাম আবু দাউদ, নাসাঈ ও আহমদ সংকলন করেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, নবীজি (সা.) বলেন, ‘ওই ব্যক্তিকে আল্লাহ রহম করুন, যে রাতে উঠে নামাজ আদায় করে এবং নিজ স্ত্রীকে জাগিয়ে দেয়। আর স্ত্রী জাগ্রত হতে না চাইলে তার চেহারায় পানির ছিটা দেয়। অনুরূপ আল্লাহ ওই নারীকে দয়া করুন, যে রাতে উঠে নামাজ আদায় করে এবং স্বীয় স্বামীকে জাগ্রত করে দেয়। সে অস্বীকার করলে তার চেহারায় পানির ছিটা দেয়।’ (আবু দাউদ : ১৩১০)।

২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরি মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার
সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর আলী হাসান তৈয়ব

মন্তব্য করুনঃ