সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের

118
|| প্রভাষ আমিন ||

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তখনকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তা নিছক কাব্য নয়, মহাকাব্য। মাত্র ১৮ মিনিটের ভাষণে ২৩ বছরের বঞ্চনার ইতিহাস তুলে ধরা যায়, একটি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করা যায়; বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ না শুনলে বিশ্বাস করা কঠিন।

এই ভাষণ নিয়ে অনেক লেখা পড়েছি, অনেকের অভিজ্ঞতা শুনেছি। তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছে শিক্ষক ও কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের অভিজ্ঞতা। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে গিয়েছিলেন এক বিদেশী সাংবাদিকের দোভাষী হিসেবে। সেই সুবাদে মঞ্চের খুব কাছে বসার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি।

ভাষণের শুরুতে তিনি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ অনুবাদ করার চেষ্টা করলে সেই সাংবাদিক তাকে ইশারায় থামিয়ে দেন। পরে সেই সাংবাদিক তাকে বলেছেন, অনুবাদ করার দরকার নেই। বঙ্গবন্ধু কী বলেছেন, তা হয়তো বোঝেননি সেই সাংবাদিক। তবে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের আবেগটা ধরতে তার কোনোই অসুবিধা হয়নি।

আসলেই বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু মানুষ যা শুনতে চায়, তার সবই বলেছেন; কিন্তু পাকিস্তানীরা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদীর অভিযোগ আনতে পারেনি। উত্তাল জনসমুদ্রে, তুঙ্গস্পর্শী আবেগের সাথে পরিমিতির এমন মিশেল সত্যিই বিরল। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণবাঙালির সম্পদ, বাংলাদেশের সম্পদ। আর ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবরের পর থেকে এই সম্পদ আর বাংলাদেশের একার নয়, এখন বিশ্বের সম্পদ।

সেই ভাষণকে ইউনেস্কো বিশ্ব প্রামাণ্য দলিলের স্বীকৃতি দিয়েছে।  ব্রিটিশ ঐতিহাসিক জ্যাকব এফ ফিল্ড গত আড়াই হাজার বছরের সেরা ভাষণ নিয়ে একটি সংকলন গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন। তাতেও ঠাঁই পেয়েছে বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের এই স্বীকৃতি জাতি হিসেবে আমাদের গর্বিত করে। এ অর্জন আওয়ামী লীগের নয়, এ অর্জন আমাদের সবার।

বঙ্গবন্ধু যখন এই ভাষণটি দেন, তখন আমি বছর দুয়েকের শিশু। কিন্তু পরে কয়েক হাজারবার ভাষণটি শুনেছি। যতবার শুনেছি, ততবার উজ্জীবিত হয়েছি দেশপ্রেমে। কবি নির্মলেন্দু গুণ সেই বিকেলের ছবি এঁকেছেন কবিতায়-

‘সেদিন এই উদ্যানের রূপ ছিল ভিন্নতর।

না পার্ক না ফুলের বাগান, এসবের কিছুই ছিল না,

শুধু একখন্ড অখন্ড আকাশ যেরকম, সেরকম দিগন্ত প্লাবিত

ধু ধু মাঠ ছিল দূর্বাদলে ঢাকা, সবুজে সবুজময়।

আমাদের স্বাধীনতা প্রিয় প্রাণের সবুজ এসে মিশেছিল

এই ধু ধু মাঠের সবুজে।’

কারা এসেছিলেন সেদিনের সেই সমাবেশে?  এই প্রশ্নের উত্তরও লেখা আছে নির্মলেন্দু গুণের কবিতায়-

‘কপালে কব্জিতে লালসালু বেঁধে

এই মাঠে ছুটে এসেছিল কারখানা থেকে লোহার শ্রমিক,

লাঙল জোয়াল কাঁধে এসেছিল ঝাঁক বেঁধে উলঙ্গ কৃষক,

পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে এসেছিল প্রদীপ্ত যুবক।

হাতের মুঠোয় মৃত্যু, চোখে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল মধ্যবিত্ত,

নিম্ন মধ্যবিত্ত, করুণ কেরানী, নারী, বৃদ্ধ, বেশ্যা, ভবঘুরে

আর তোমাদের মতো শিশু পাতা-কুড়ানীরা দল বেঁধে।’

সেই সমাবেশে বঙ্গবন্ধুর আসা, তার  আগের সময়কার অনেক বর্ণনা আছে ইতিহাসে। তবে গুণদার মত করে আর কে বোঝাতে পেরেছিলেন সেই সময়কার ছবিটি? আবারও

নির্মলেন্দু গুণের কাছে হাত পাতি-

‘একটি কবিতা পড়া হবে, তার জন্য কী ব্যাকুল

প্রতীক্ষা মানুষের: ‘কখন আসবে কবি?’ ‘কখন আসবে কবি?’

শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,

রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে

অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।

তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল

হৃদয়ে লাগিল দোলা, জন সমুদ্রে জাগিল জোয়ার

সকল দুয়ার খোলা। কে রোধে তাঁহার বজ্রকন্ঠ বাণী?’

বঙ্গবন্ধু কবি নন, একজন রাজনীতিবিদ। কিন্তু ৭ মার্চেও সেই বিকেলে তিনি যেন হয়ে উঠেছিলেন শ্রেষ্ঠ এক কবি। মাত্র ১৮ মিনিটের একটি স্বতস্ফুর্ত ভাষণে কীভাবে একটি জাতির আশা-আকাঙ্খা, স্বাধীনতার স্বপ্নকে ধারণ করা যায়, তার অনন্য এক দলিল এই ভাষণ।

এখন যখন আমরা ভাষণটি শুনি, মনে হতে পারে, এ আর এমন কী? কিন্তু ভাবুন একবার সেই ৭ মার্চের কথা। ৭০এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে আওয়ামী লীগ। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের কেউ পাকিস্তান শাসন করবে, এটা মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না পশ্চিমাদের পক্ষে। চলছিল নানা ষড়যন্ত্র, টালবাহানা।

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবান করেন। সবাই আশায় বুক বুক বাধে। কিন্তু ১ মার্চ এই অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করলে ফুঁসে ওঠে জনতা। বঙ্গবন্ধুর সামনে তখন স্বাধীনতার ঘোষণা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। জনতার দাবি, ছাত্রনেতাদের চাপ, সিনিয়র নেতাদের ভিন্নমত- সবমিলিয়ে বঙ্গবন্ধু তখন চিড়ে-চ্যাপ্টা।

বেগম মুজিব বলে দিলেন,  তোমার হৃদয় যা বলবে, তুমি তাই বলবে। বঙ্গবন্ধুর জন্য সবচেয়ে সহজ উপায় ছিল জনতার আবেগের সাথে সুর মিলিয়ে সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দেয়া। কিন্তু তাতে কী হতো? হয়তো সাথে সাথেই ঝাঁপিয়ে পড়তো পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। সেদিনই রক্তগঙ্গা বয়ে যেতে পারতো রেসকোর্স ময়দানে। সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে আসা আমাদের মুক্তির সংগ্রাম বিশ্বে পরিচিতি পেতে পারতো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা বঙ্গবন্ধু হয়ে যেতে পারতেন বিচ্ছিন্নতাবাদী।

আবার স্বাধীনতার কথা বলা ছাড়া সেদিনের রেসকোর্সের লাখো মানুষকে ঘরে ফেরানোও কঠিন ছিল। বঙ্গবন্ধু তার ভাষণ শেষ করলেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম/এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বুদ্ধিমত্তার কী অসাধারণ প্রয়োগ! ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ার ডাক দিলেন, যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিলেন। সবই বলে দিলেন। কিন্তু পাকিস্তানীদের উপায় ছিল না তাকে ধরার। শত উস্কানি সত্বেও বঙ্গবন্ধু সেদিন দারুণ সংযমের পরিচয় দিয়েছিলেন। আসলে তখন একটা দারুণ কৌশলের খেলা চলছিল।

আলোচনার নামে কালক্ষেপণ করছিল পশ্চিমারা। চলছিল অস্ত্র ও সৈন্য সমাবেশ। কিন্তু বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করলেন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর আক্রমণের জন্য। ২৫ মার্চের মধ্যরাতে অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে পাকিস্তান হলো হামলাকারী আর ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বঙ্গবন্ধু হলেন স্বাধীনতাকামী নেতা।

মাত্র ১৮ মিনিটে এক হাজার ৮৬ শব্দে একটি জাতির ২৩ বছরের বঞ্চনার ইতিহাস ধারণ করে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে মূর্ত করা- কল্পনাকেও হার মানায়। কোনো লিখিত স্ক্রিপ্ট ছাড়া এমন একটি মহাকাব্য লেখা সম্ভব? শুনলে মনে হবে, একটুও মেদ নেই, একটিও বাড়তি শব্দ নেই। অথচ কোনো না বলা কথা নেই। সব দাবি উঠে এসেছে নিপুণভাবে, সব আবেগ উঠে এসেছে দারুণভাবে। দাবি আছে, হুমকি আছে।

বঙ্গবন্ধু বলেছেন হৃদয় থেকে, কিন্তু তাতে বিবেচনার অসাধারণ মিশেল। নির্মলেন্দু গুণ তার কবিতা শেষ করেছিলেন-

‘সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।’

আসলেই সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

মন্তব্য করুনঃ