বিশ্বকাপ ক্রিকেটে শ্রীলঙ্কান জার্সি সমুদ্র দূষণের বিরুদ্ধে মানব সচেতনতা

119

এডভোকেট আহমেদ মিরাজ।

সমুদ্রকে বলা হয় পৃথিবীর ফুসফুস। কারণ মানুষের ফুসফুস যেমন দূষিত রক্ত শোষণ করে বিশুদ্ধ করে শরীরে প্রবাহিত করে ঠিক তেমনি সমুদ্র বায়ুমন্ডল থেকে দূষিত বাতাস শোষণ করে নেয়। আর জীব বৈচিত্র্যের দিক দিয়ে সমুদ্র একটি অনন্য ইকোসিস্টেম। যেখানে শত কোটি প্রাণীর বসবাস এমকি স্থল ভাগের চেয়ে বেশি প্রাণীর বসবাস সমুদ্রে এবং ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র প্লাঙ্কটন থেকে বৃহৎ দানব আকৃতি জীব সব তো সমুদ্রে।
অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সমুদ্রের অবদান অপরিসীম। পৃথিবীর মানুষের ২১% খাদ্যের যোগান দেয় সমুদ্র। মানুষের জ্বালানীর জন্য তেল ও গ্যাসের ৪৮% মজুত আছে সমুদ্রগর্ভে। বিশ্বের ব্যবসা বাণিজ্যের প্রায় ৭০-৮০% নিয়ন্ত্রিত হয় সমুদ্র পথে। কিন্তু এত অতুলনীয় উপকারী সমুদ্রকে আমরা দূষণ করে ধ্বংস করছি প্রতিনিয়ত। প্লাস্টিক বর্জ্য ও রাসায়নিক বর্জ্যে নষ্ট হচ্ছে সমুদ্রের পরিবেশ আর আলো দূষণে ধ্বংস হচ্ছে জীব বৈচিত্র্য। প্রতি বছর ৯৫ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে ফেলা হয়, যা প্লাস্টিক দানায় পরিণত হয় এবং প্লাস্টিক দানা সমুদ্রের প্রাণী খাদ্য ভেবে গ্রহণ করে মৃত্যুবরণ করে। এভাবে শত শত জীব হচ্ছে বিপন্ন। অথচ আমরা প্লাস্টিকের রিসাইকলিং এর মাধ্যমে বর্জ্য প্লাস্টিকের সুষ্ঠ ব্যবহার করতে পারি, যা শ্রীলঙ্কান জার্সি তৈরি করে সচেতনতার ডাক দিয়েছে।

ইউরোপের বেশি ভাগ দেশ যেমন সুইডেন,ডেনমার্ক,সুইজারল্যান্ড ইত্যাদি দেশে প্লাস্টিকের রিসাইকেলিং শিল্প অনেক জনপ্রিয় ও লাভজনক ব্যবসা। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা তাঁদের জার্সিতে সামুদ্রিক কচ্ছপ এর ছবি দিয়েছে জলছাপে।
এত প্রাণী থাকতে কচ্ছপ কেন? কচ্ছপ কে বলা হয় সমুদ্রের আদি প্রাণী। প্রায় ১০০ কোটি বছর ধরে তাদের সমুদ্রে বসবাস। কচ্ছপ কে ডাইনোসরের যুগের প্রাণী বলে অবিহিত করা হয়। কিন্তু আজ আমাদের মনুষ্য জাতির কারণে কচ্ছপ হুমকির মুখে এবং বিলুপ্ত প্রাণীর তালিকায়। বিগত কয়েক দশকে কচ্ছপ ১০ শতাংশে নেমে এসেছে।

প্লাস্টিকের বর্জ্য সমুদ্রে প্লাস্টিক দানায় পরিণত হয় আর তা খেয়ে কচ্ছপ মারা যাচ্ছে। আর আলো দূষণের ফলেও জন্মের পর পরই কচ্ছপ মৃত্যু কোলে ঢলে পড়ছে। উদাহরণস্বরূপ কচ্ছপ সমুদ্র তীরবর্তী বালু চরে ডিম ফুটিয়ে বাচ্ছা জন্ম দিয়ে তাদের প্রজনন ধারা অব্যাহত রাখে। সদ্য জন্ম নেয়া কচ্ছপ শিশুর জীবনের জন্য সমুদ্রের জলে নামতে হয়।কচ্ছপ শিশুকে সমুদ্র জলে নামতে সহায়তা করে চাঁদের আলো। চাঁদের আলোয় প্রাকৃতিক নিয়মে কচ্ছপ সমুদ্রে নেমে নব জীবন ফিরে পায়। কিন্তু সমুদ্র তীরে অবস্থিত সোডিয়াম বাতির আলো চাঁদের আলো থেকে উজ্জ্বল হওয়ায় কচ্ছপ শিশু বাতির কৃত্রিম আলোকে চাঁদ ভেবে জীবনের আশায় কৃত্রিম আলোর দিকে গমন করে উল্টো পানির বিপরীতে এসে বালু চরে, রাস্তায় কিংবা নালা নর্দমায় তাদের করুণ মৃত্যু হচ্ছে।

আমরা মানুষরা দিন দিন প্রকৃতির বিরুদ্ধ আচরণ করছি। নিজেদের ইকোসিস্টেম বা বাস্তুসংস্থানকে দূষিত করে পৃথিবীকে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলছি। প্রকৃতিকে তার নিজ নিয়মে চলতে দিতে হয়। উদাহরণস্বরূপ চেরনোবিল শহরের বর্তমান চিত্র আলোকপাত করা যায়। হিরোশিমা নাগাসাকির পর বিগত শতাব্দীর ভয়াবহ পরামানিক বিপর্যয় হলো রাশিয়ার চেরনোবিল শহরের চেরনোবিল পরামানিক চুল্লীর বিস্ফোরণ। বিস্ফোরণের পর শহরটি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে এবং কতৃপক্ষ ঐ শহরটি কে ২০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এই ২০ বছরে শহরটিতে কোন মানুষ যায়নি অথচ ২০ বছরের শহরের ইট পাথরের ধ্বংস স্তুুপে জন্ম নিয়েছে হাজারো বৃক্ষ রাজী। হাজার হাজার গাছপালা,তৃণ ও গুল্মে শহরটি অরণ্যে রূপ নিয়েছে। গাছপালার পাশাপাশি পূর্বের শহর বর্তমান বনে ঠাঁই হচ্ছে হরিণ,ভালুক,শিয়াল থেকে শুরু করে শত শত জীবজন্তু এবং হিংস ও নেকড়ের মত শিকারী প্রাণীও। পাখির কলকাকলি ও ফুলে ফলে নিষিদ্ধ চেরনোবিল শহর আজ প্রাণীকুলের অভয়ারণ্য। তাই বলতে হয় প্রকৃতিকে তার নিজ নিয়মে চলতে দিলে প্রকৃতি তার ভারসাম্য রক্ষার জন্য নিজেই যথেষ্ট।
আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশ স্রষ্টার সৃষ্ট একটি প্রকৃতিক একুরিয়াম বা একটি প্রকৃতিক মিউজিয়াম। আমাদের কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত টি এখনো প্রাণীকূলের জন্য বসবাস যোগ্য। ধীরে ধীরে যে দূষণ হচ্ছে তা যদি সঠিক পরিকল্পনায় রোধ করা না যায় তাহলে তা ধ্বংস ক্ষেত্রে পরিগনিত হবে অদূর ভবিষ্যতে। শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট বোর্ডকে ধন্যবাদ পরিবেশ বান্ধব সৃষ্টিশীল ও সবুজ পৃথিবী রক্ষায় সচেতনতা সৃষ্টির জন্য। আজ যে ফল টি আমি খেতে পারছি সেই ফলের গাছ আমার পূর্বপুরুষরা রোপণ করেছিল বিধায় ফলটি আমি পেয়েছি। কিন্তু আমরা আমাদের জন্য, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কি করে যাচ্ছি যা আমাদের পূর্বপুরুষরা করেছিল?? আসুন ধ্বংসযজ্ঞ হতে ফিরে এসে সৃষ্টির কাজ করি। বিধাতার সৃষ্ট প্রকৃতির বিরুদ্ধে আচরণ না করে প্রকৃতিকে তার মত চলতে দিই।

লেখক – এডভোকেট আহমেদ মিরাজ,চট্টগ্রাম জজ কোর্ট।

মন্তব্য করুনঃ