সৎ সাংবাদিকের কোনো বন্ধু নেই

136

||শেখ সাইফুল ইসলাম কবির ||

১৯৯৪ সালে প্রথম যখন সংবাদপত্রের জগতে পা রাখি, প্রথম দিনই আমাদের সাংবাদিকতার ভালো ভালো দিক সম্পর্কে বলা হয়েছিল। সাংবাদিকদের দায়িত্ব, কর্তব্য ও এথিক্স সম্পর্কে ও কী কী করা উচিত এবং কী কী করা উচিত নয়; এ সম্পর্কে বিস্তৃত জ্ঞানলাভের পর দিনশেষে যখন অফিস থেকে নিজেকে বেশ কেউকেটা আপসহীন সমাজসংস্কারক ভাবতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু এই আবেগের বেলুনটা চুপসে যেতে ২৪ ঘণ্টাও সময় লাগেনি, যখন পরের দিন একজন অতীব প্রথিতযশা বর্ষীয়ান সাংবাদিক তার ভাষণে বললেনÑ ‘ভারতে প্রথম সংবাদপত্র ‘বেঙ্গল গেজেট’ প্রকাশ করেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্রিটিশ কর্মচারী জেমস অগাস্টাস হিকি, ১৮৭০ সালে। কলকাতায় প্রথম মুদ্রণযন্ত্রটিও তিনি বসান। প্রথম দিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের সামরিক ও অ্যাকাউন্টস বিল এই ছাপাখানাতেই ছাপত, কিন্তু ক্রমেই হিকি যখন ব্রিটিশ শাসকদের ব্যঙ্গবিদ্রƒপ-সমালোচনা শুরু করলেন, তখন বিল ছাপার বরাত দেওয়া কোম্পানি বন্ধ করে দিল। হিকির পর আসেন বাকিংহাম। তিনি খবরের কাগজকে ‘গরিব মানুষের বিশ্ববিদ্যালয়’ বলেই ভাবতে শুরু করেন। ফলে ব্রিটিশরাজ তাকেও জেলে পাঠান। কাজেই বন্ধুরা, মনে রাখবেনÑ আপনারা চাকরি করতে এসেছেন, কিছুই পালটাতে পারবেন না। কী বলা হবে বা না হবে তার সিদ্ধান্ত নেবে মালিকপক্ষ। আপনি শুধু সেই নীতি প্রয়োগ করবেন।

আজকের মিডিয়া এখন রীতিমতো শক্তিশালী। জনমত তৈরিতে বড় রকমের ভূমিকা রয়েছে ব্যবসায়িক মিডিয়ার। সংবাদপত্রের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে টেলিভিশন চ্যানেল। সঙ্গে রয়েছে এফএম রেডিও, ওয়েবসাইট। হিসাব বলছে, বর্তমানে রাজ্যের প্রায় সব মানুষের কাছেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পৌঁছে গেছে সংবাদমাধ্যম। আজকের মিডিয়া শুধু সংবাদ বা বিনোদনই দেয় না, সংগঠকের ভূমিকাও পালন করে। টেলিভিশনের ক্যামেরার জন্যই সংগঠিত হয় মোমবাতি মিছিল। কিন্তু বস্তিবাসীর ঘর ভাঙা হলে, ঘর থেকে তাড়িয়ে দিলে মিডিয়া নীরব। কিন্তু সমকামিতার বিরুদ্ধে কোনো আইন পাস হলে তার প্রতিবাদে মোমবাতি মিছিল সংগঠিত করে মিডিয়া। কিন্তু মোমবাতি মিছিলের গ-ি ডিঙিয়ে বড় সমাবেশ বিক্ষোভ বা ধর্মঘটের পথে গেলেই আপত্তি মালিকপক্ষের। নিও লিবারেল অর্থনীতির যুগে ভারতের মিডিয়া এখন করপোরেট মিডিয়ায় পরিণত হয়েছে। এই মিডিয়ার মালিকানাস্বত্বের চেহারা এখন পারিবারিক তো আর নেই-ই, পুরোপুরি দেশীয়ও আর নেই। খুবই দ্রুত রূপান্তরিত হয়েছে আন্তর্জাতিক চেহারায়। কেবল মুুদ্রণ ও বৈদ্যুতিক সংবাদমাধ্যমই নয়, প্রকাশনা, চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান, বিনোদনশিল্পÑ সবকিছু ক্রমেই এখন একই মালিকানায় কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। এক কথায়, একটি ভুবনজোড়া বাণিজ্যিক মিডিয়ায় পরিণত হয়েছে।

এডমন্ড বার্ক প্রথম সংবাদমাধ্যমকে ‘ফোর্থ এস্টেট’ বলে অভিহিত করেন। গণতন্ত্র আইন শাসন ও বিচার বিভাগের মধ্যে সমন্বয় রক্ষার কথা ভারতীয় সংবিধানে বলা হয়েছে। এটিও ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে যে, সংবাদমাধ্যম চিরকাল প্রতিষ্ঠানবিরোধী ভূমিকা নেয়। সমালোচনা করাটাই সাংবাদিকের কাজ, সরকারের মুখপাত্র হয়ে গুণকীর্তন করা নয়।

উপনিবেশবাদকে বিদায় জানিয়ে স্বাধীনতা-গণতন্ত্রের ধব্জা উড়িয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অসহিষ্ণুতা আজ এক চরম জায়গায় পৌঁছেছে। জাতীয় মূলস্রোতে কংগ্রেসের অবক্ষয় শুরু হওয়ার পর থেকে দিল্লিতে রাজনৈতিক অস্থিরতার দৌলতে দিল্লির মসনদে অনেক রকমের প্রধানমন্ত্রী দেখার সৌভাগ্য ভারতবাসীর হয়েছে। দেব গৌড়া সাত নম্বর রেসকোর্স রোডে ডেকে জমিয়ে আড্ডা মারতেন। কে কার পক্ষে-বিপক্ষে, তা নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী উত্তর প্রদেশে গরুর মাংস বাড়িতে রাখার মিথ্যে অভিযোগে জনৈক মুসলমান নাগরিককে খুন করার সংবাদ পরিবেশন নিয়ে যেভাবে সাংবাদিকদের ওপর খড়্গহস্ত হলেন, তা একজন প্রধানমন্ত্রীকে মানায় না। অন্তত গণতান্ত্রিক দেশে।

বর্তমানে আব্রাহাম লিংকনের দেশেও মার্কিন সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত সদ্য নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট। হোয়াইট হাউসের ভেতর থেকে সাংবাদিকদের মিডিয়া কেন্দ্রটিই নাকি তুলে দেওয়া হবে? একদম প্রেসিডেন্টের বাড়ি আর তার অফিসঘরের কাছেই এটি। কেন্দ্রটি মেকশিফট ব্যবস্থা হলেও দারুণ। সম্মেলন কক্ষ। সাংবাদিকদের লেখার জায়গা। পানীয় থেকে গ্রন্থাগার সব মজুদ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী তার শোবারঘরের নাকের ডগায় এমন ব্যবস্থা ভাবতে পারবেন? আমেরিকাতেও এ ব্যবস্থা শেষ করার ডাক এসেছে। সম্পাদকরা একত্র হয়ে প্রতিবাদ করছেন। এ দেশে কিন্তু সাংবাদিকরা আজও ঐক্যবদ্ধ হয়ে ক্ষমতাসীন দলের অসহিষ্ণুতার প্রতিবাদ জানাচ্ছেন না।

শুধু নরেন্দ্র মোদির কথাই বা বলব কেন? একই অসহিষ্ণুতা তো নানা রাজ্যে। লক্ষেèৗয়ে কাশিরাম নিজের হাতে পিটিয়ে ছিলেন এক অতিসক্রিয় সাংবাদিককে। তার বাসভবনেই। সেই ফুটেজও চ্যানেলে প্রদর্শিত হয়। পশ্চিমবঙ্গে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য প্রেস কর্নার ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে নিন্দিত হন। এখন তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নবান্নেও সাংবাদিকদের অবাধ যাতায়াত নিষিদ্ধ নিরাপত্তার কারণে!

মনে হচ্ছে, গদিতে বসলেই বিরুদ্ধ মত শোনার সহনশীলতা বিদায় নিচ্ছে। যত বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা, শাসকের অসহনীয়তার প্রকাশ ততই তীব্র। জওহরলাল নেহরু নিজে সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় শুধু বিশ্বাস করতেন তা নয়, তিনি ১৯১২ সালে বিলেত থেকে ব্যারিস্টার হয়ে ফিরে লিডার থেকে ইনডিপেনডেন্ট বাবার প্রতিষ্ঠিত কাগজে সাংবাদিকতাও করেন। ১৯১০ সালের প্রেস অ্যাক্টের প্রতিবাদে নেহরুর ভূমিকা স্মরণীয় ইতিহাস। কিন্তু সেই নেহরুই চীন আগ্রাসন নিয়ে সরকারি ব্যর্থতার খবর দেখে কলকাতার খবরের কাগজ সম্পর্কে অসন্তুষ্ট হন। তিনি মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেনকে দুটি সংবাদপত্রের কর্ণধারের সঙ্গে কথা বলান। তখন সংবাদপত্রের মালিকপক্ষ জানান যে, সরকারের কথা শুনে সাংবাদিকতা করা যাবে না। সরকার এরপর সে কাগজ দুটিতে বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেয়। তাতেও সাংবাদিকতার প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার দৃষ্টিভঙ্গি ত্যাগ করেনি সেই কাগজের মালিকপক্ষ। পুরনো দিনের সেই পত্রিকাগুলোয় যারা কাজ করতেন, তাদের কোনো মাসে বেতন হতো, কখনো হতো না। খুবই দরিদ্র জীবনযাপন করতেন তারা। ফলে তাদের এক ধরনের সাহস ছিল। চাকরি হারানোর ভয় ছিল না। যেহেতু আয় কম, তাই সেটি চলে গেলে তেমনটি মাথাব্যথা থাকত না। কিছু না কিছু একটা হয়ে যাবে। জীবন চলে যেত।

কিন্তু এখন মিডিয়াগুলো করপোরেট আকার নিয়েছে। পুরো পৃথিবীতেই তাই। তাতে দোষের কিছু হওয়ার কথা ছিল না। একটি ভালো বিনিয়োগ না হলে অনেক কিছুই করা যায় না। এখন ব্যবসায়ীরা মুনাফার জন্য (কিংবা ভিন্ন উদ্দেশ্যে) বিনিয়োগ করছেন। সাংবাদিকদের বেতন-ভাতা, সুবিধা অনেক বেড়ে গেছে। এখন বাংলাদেশে অসংখ্য সাংবাদিক আছেন, যাদের বেতন লক্ষাধিক টাকার ওপর। অনেক সাংবাদিক আছেন, যারা ঢাকা শহরে ফ্ল্যাট-প্লট ও গাড়ির মালিক। তাদের এখন চাকরির ভয় আছে, যা আগে ছিল না। এ চাকরি যদি চলে যায়, তাহলে তাদের জীবনযাত্রার মান হঠাৎ করেই ছন্দপতন হবে। ফলে তারাও বিভিন্ন উপায়ে সেই জীবনকে ধরে রাখতে চান এবং ক্ষেত্রবিশেষে অসৎ উপায়ে হলেও অর্থের মালিক হতে চান; মিডিয়াও সে সুযোগ করে দিয়েছে।

ডায়ালগ নামক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া যদি বন্ধ হয়ে যায়, যদি সরকারের একমুখী প্রচারই হয় ভারতীয় সাংবাদিকতার পূর্বশর্ত, সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতা ও সাংবাদিকদের মধ্যে ব্যক্তিগত আত্মীয়তার সম্পর্ক বোধহয় আজ আর আশীর্বাদ নয়, অভিশাপ। আগে মন্ত্রীরা সাংবাদিকদের তার গাড়িতে তুলে জেলা সফরে যেতেন। গল্প করতেন, তাদের সঙ্গে মুড়ি খেতেন, আজও তথ্য সংগ্রহের জন্য রাষ্ট্রনেতাদের সঙ্গে সাংবাদিকদের ঘনিষ্ঠতা বিশেষ জরুরি। কিন্তু অতীতে এত অঘোষিত সেন্সরশিপ ছিল না। সাংবাদিকতার মূল শর্ত ছিল নিরপেক্ষতা।

কিন্তু এখন আর নিরপেক্ষ বলে কিছু নেই। এখন শিক্ষকদের যেমন দল আছে, ডাক্তার, প্রকৌশলী, আইনজীবী, সরকারি আমলা, পুলিশ, সেনাবাহিনী, ব্যবসায়ী, মসজিদের ইমাম কিংবা ক্লাব তাদের যেমন রাজনৈতিক দলের পরিচয় আছে, তেমনইভাবে সাংবাদিকদেরও রাজনৈতিক পরিচয় দাঁড়িয়ে গেছে। এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়ে গেছে যে, আমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের প্রশংসা করতেই ফিসফাস শুরুÑ উনি কোন পন্থি? লেখার মেরিট বিচার করার আগে তাকে একটি ঘরানায় ফেলা হবে। এরপর সেই লেখার বিশেষণ হবে। আপনি যদি বলেন, বাংলাদেশ উন্নতির পথে এগোচ্ছে। প্রথমেই বলা হবে ব্যাটাচ্ছেলে বাংলাদেশ সরকারের থেকে ভালো পয়সা পায়। আর বাংলাদেশে বলা হবেÑ ভারতীয় তো, হাসিনার প্রশংসা করবেই।

ব্রিটেনকে ধরা হয় মিডিয়া জগতে সবচেয়ে ম্যাচিউরড মিডিয়া। ওখানকার পাঠকরাও তাই। সেই ব্রিটেন তার দেশের মানুষের কথা প্রকাশ করার জন্য তৈরি করেছিল বিবিসি। এটি জনগণের টাকায় চলে এবং সরকারের সমালোচনা করে। তারা মিডিয়াটাকে জনগণের একটি ভয়েস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং গণতন্ত্রের আরেকটি স্তম্ভ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। এখন যে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নড়বড়ে, সে দেশের মিডিয়া খুব ভালো ভূমিকা রাখবে সেটি হওয়ার কথা নয়। কারণ মিডিয়া তো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ। ভারতের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অন্য স্তম্ভগুলো যেমন ভেঙে পড়েছে, গণমাধ্যমও তাই হয়েছে।

বিশিষ্ট মার্কিন বুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কি তার ‘ক্লাস ওয়ারফেয়ার’ (১৯৯৬) গ্রন্থে অ্যালেক্স কেরির ‘চেঞ্জিং পাবলিক ওপিনিয়ন : দ্য করপোরেট অফেন্সিভ’ শীর্ষক রচনাটি আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন : ‘বিংশ শতাব্দীতে গণতন্ত্র সম্পর্কে প্রধান তিনটি ঘটনা হলোÑ সর্বজনীন ভোটাধিকার, বৃহৎ করপোরেশনের উদ্ভব ও করপোরেট প্রোপাগান্ডা’।

আর এই করপোরেট প্রোপাগান্ডার প্রণোদনায় আছে বিদেশি সাম্রাজ্যবাদ। ভারতের ক্ষেত্রে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চীন, ভারত ও মালয়েশিয়া। নিও লিবারেল অর্থনীতির জালে বড় দেশগুলো ইতোমধ্যে ছোট দেশগুলোকে বেঁধে ফেলেছে এবং সর্বশেষ স্ট্র্যাটেজিক সহযোগিতা চুক্তি সই করিয়ে তাকে তার অধস্তন মিত্র বানিয়েছে।

আসলে সাদা ও কালোর মধ্যে ধূসরতা থাকে। সেই ধূসরতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে প্রকৃত সত্য। সব ব্যবস্থাতেই যদি ঘুণ ধরে, তবে সংবাদমাধ্যম ব্যবস্থায় ঘুণ ধরবে না কেন? কিন্তু এটিও ঘটনা, ভারতে বিশ্বায়নের পর সংবাদমাধ্যমেও এক দ্রুত পরিবর্তন এসেছে। বাজার অর্থনীতি যেমন গ্রামীণ ভারতকে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে বদলে দিয়েছে অনেকটাই, সেভাবে সংবাদমাধ্যমওÑ কী প্রিন্ট, কী বৈদ্যুতিক, এসেছে এক বিপুল পরিবর্তন। স্থানীয় ভাষার সাংবাদিকতাতেও পরিবর্তন কিছু কম হয়নি। পাঠক ও বাজার এ সম্পর্কটি জটিল। যিনি পাঠক, তিনিই উপভোক্তা। কলেজজীবনে যখন লিটল ম্যাগাজিন বের করতাম, তখন সম্পাদকীয় উপাদানে কোনো আপস করতে হয়নি। ঠিক সেভাবে পত্রিকাটি আমজনতার কাছেও পৌঁছয়নি। রাজনৈতিক সততার পরাকাষ্ঠা হয়ে নিষ্ফল মাথা কুটে মরেছে।

এখন তো অনেকে বলছেন, সম্পাদকরা আসলে করপোরেট এডিটোরিয়াল ম্যানেজার। সাংবাদিকরা হলেন করপোরেট এডিটোরিয়াল এক্সিকিউটিভ। করপোরেট পলিসি ও সম্পাদকীয় নীতিতে কোনো ফারাক নেই। সাংবাদিকরা সেই নীতির প্রয়োগে ব্যস্ত।

১৯৯৮ থেকে ২০০৬Ñ এই অল্প কয়েক বছরের মধ্যে ভারতে ৫০টি স্যাটেলাইট নিউজ চ্যানেলের জন্ম হয়। তার পরেই এটি দ্রুত বেড়ে ৩০০ সংখ্যায় পৌঁছে। এখন সেই সংখ্যা বাড়তে বাড়তে যে কোথায় পৌঁছেছে, তা বলার নয়। প্রশ্নটি হলোÑ বাজার অর্থনীতিতে এ চ্যানেলগুলোর টিকে থাকার জন্য বলা হয় তিনটি ‘সি’ প্রয়োজন। একটি ‘সি’ ক্রিকেট, দ্বিতীয় ‘সি’ সিনেমা আর তৃতীয় ‘সি’ ক্রাইম বা অপরাধ। আসলে ভারতের মধ্যে দুটি ভারত আছে। একটি অভিজাত ভারত। যেখানে দিল্লি ও অভিজাত শহরগুলোই সব। আর একটি গ্রামীণ ভারত। একটি প্রত্যন্ত গ্রামের অন্ত্যজ মানুষের সুখ-দুঃখের কথা লিখলে কি মার্সিডিজ বেঞ্জ বিজ্ঞাপন দেবে?

গণতন্ত্রে বিতর্ক সব সময়েই স্বাগত। সে তো বিদেশেও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে যে নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা বলে আর কিছু আছে কিনা। ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বার্টন জন ও পেনসিলভানিয়ার কিরস্টেন জনসন সম্পাদিত একটি বই ‘নিউজ উইথ এ ভিউ’-এ বিভিন্ন প্রবন্ধে বলা হয়েছে, আধুনিক সাংবাদিকতায় নিরপেক্ষতার প্রশ্নে গ্রহণ শুরু হয়েছে। আমি অবশ্য এ বিষয়ে আমার প্রথম ঊর্ধ্বতন প্রয়াত সাংবাদিক বরুণ সেনগুপ্তের একটি আপ্তবাক্য এখনো মেনে চলি। সেটি হলোÑ কোনো সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিক কোনো ব্যক্তি বা দল যে উঠছে, তাকে টেনে নামাতে পারে না। আর যে নামছে, তাকে টেনে তুলতে পারে না। তাহলে আমরা পারিটা কী? যে উঠছে, তাকে একটু ধাক্কা দিয়ে আরও একটু দ্রুত তুলে দিতে পারি। আর যে নামছে, তাকে ধাক্কা দিয়ে তার পতন আরও ত্বরান্বিত করতে পারি। এটি হলো প্রকৃতির আইন। বলা যায়, সাংবাদিকতার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি। কাজেই কোনো রাজনৈতিক নেতা বা নেত্রীর উত্থানের সবটাই করপোরেট মিডিয়ার কারসাজি, এটিকে আমি অতিসরলীকরণ বলে মনে করি।

বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সাংবাদিকতার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। না হলে যা খুশি লেখার প্রবণতা কমবে না এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া বাড়বে। ফলে প্রশাসন ও সংবাদমাধ্যমের মধ্যে দূরত্ব বাড়বেই। অবিশ্বাসের বাতাবরণ সৃষ্টি হবে আরও তীব্রভাবে।

তবুও শেষ কথা হচ্ছে, সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্নে এখনো এ পেশাই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ মাটি ও মানুষের কাছে। মাটিবর্তী সাংবাদিক কাঙাল হরিনাথ বলেছিলেন, ‘সৎ সাংবাদিকের কোনো বন্ধু থাকতে নেই।’ নীতিনৈতিকতার প্রশ্নে বলবÑ এই উক্তির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এ পেশার সত্যিকারের পেশাদারিত্ব।

মন্তব্য করুনঃ