‘হকারদের পেটে লাথি মেরে কি যুদ্ধে জয়ী হওয়া যাবে?”

179

সোনিয়া দেওয়ান প্রীতি ।। 

আমি ব্যক্তিগতভাবে ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদের পক্ষে নই। নগরের সাধারন পথচারী হিসেবে অবশ্যই আমি স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে চাই, কিন্তু অতোগুলো মানুষের মুখের ভাত কেড়ে নিয়ে নয়। আগে প্রতিটা সকাল হলেই দেখতাম- একের পর এক ভিখারীরা পেটের খিধে সইতে না পেরে সামান্য পান্তা বা ভাতের মারটুকুর জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে দরজায় দাড়িয়ে থাকত। ঘরে ঘরে অভাব-অনটন। লেখাপড়া তো দুরের কথা, ২ বেলা খাবার খেয়ে বেঁচে থাকার জন্য ৫/৬ বছরের শিশুরা লাইন ধরে টিফিন বাটি হাতে ছুটতো বিভিন্ন কল-কারখানায় কাজের জন্য। আর এখন? প্রতিটা ঘরে ঘরে মানুষ এখন আর না খেয়ে থাকেনা। কাজের অভাবে ঘরে ঘরে ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত হয়ে চুি-চিনতাই-মাদকে বুদ হয়না। কারণ, গরিবের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তারা চুরি করেনা, খুন করেনা, অন্যেরটা ছিনিয়ে নেয়না, তারা মাথার ঘাম পায়ে ঝড়িয়ে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে এটা ওটা বিক্রি করে পরিবার পরিজন চালায়। ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার আলোয় শিক্ষিত করে। খুব কাছ থেকে আমার দেখা অনেক দরিদ্র ব্যক্তি আছেন, যারা ফুটপাতে হকারি করে বস্তিতে থেকেও প্রতিটা সন্তানকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন এবং করছেন। নামেমাত্র হকার মার্কেট করে দিয়ে কে কি দেখাতে চাইছে তা তারাই ভাল জানেন। তবে একটা কথা- এসি রুমের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসি গাড়িতে চড়ে শহর ঘুরে চলা কর্তাব্যক্তিরা কোনোদিনই এইসব গরিবের দুঃখ বুঝবেন না। একটা দিন কি খোঁজ নিয়েছেন দেখেছেন এসব উচ্ছেদ করে দেয়া হকারদের কাজ বন্ধ হয়ে যাবার পর তাদের বাড়িতে চুলা জ্বলেছে কি না? তাদের ছেলে মেয়েরা স্কুল-কলেজে গিয়েছে কি না? পরিবারের সদস্যদের রোগে শোকে জরুরি ওষুধ-পথ্যের যোগান হয়েছে কি না? শহর ঘুরে খালি হওয়া ফুটপাত দেখলে ক’জনের চোখে জল ঝড়ে এসব পরিবারগুলোর কথা ভেবে? শহরটা জুড়ে তাকালে ক’জনের কাছে শহরটাকে ধুধু মরুভূমি মনে হয়? সবাই যার যার নিজের চিন্তায় মশগুল। শুধু কি তাই? নিম্ন থেকে মধ্য ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো মাত্র ২শ’ টাকায় যে পন্যটি ফুটপাতের হকারদের থেকে কিনতে পারত, সেই একই পন্য এখন শপিং মলগুলোতে দ্বিগুন ও চড়া দামে কিনতে হচ্ছে আমাদের। অথচ একই পন্য একই কোয়ালিটি। চারদিকে তাকালে শুধুই শূণ্যতা দেখতে পাই। জনমানবহীন ফুটপাত ও বিভিন্ন শপিং মল। অথচ সকাল থেকে মাঝরাত অবধি মানুষজন এই ফুটপাতেই কত কেনাকাটা করত। কেউ সস্তায় পেয়ে সাধ্যের মধ্যে প্রয়োজনের জিনিষপত্র কিনত, আর কেউ বেচা বিক্রি করে পরিবারের সকল প্রয়োজন মেটাতে পারত। সুতরাং আজ যদি ক্ষতি কারো হয়ে থাকে, সেটা এই উভয় পক্ষের হয়েছে। আর লাভবান হয়েছেন কারা? তা আর খোলাশা করে বলতে হবেনা বোধকরি। কেননা হকার উচ্ছেদের শুরু থেকে ইতি পর্যন্ত সমস্ত পরিস্থিতির বিচার বিশ্লেষন ও আমার এই লেখার মাঝেই একটু মাথা খাটালে বেরিয়ে আসবে লাভবান ব্যক্তিদের পরিচয়। আচ্ছা বলুন তো- শহর থেকে হকারমুক্ত করার নামে যে যুদ্ধ, সেই যুদ্ধে নেমে আসলে আমরা কতটুকু জয়ী হয়েছি? এসব গরিব হকারদের পেটে লাথি মেরে কি যুদ্ধে জয়ী হওয়া যাবে? সৎ উপার্জনে আত্মনির্ভরশীল এসব পরিশ্রমী গরিবরা তো এই সমাজেরই অংশ। সমাজের একটা অংশকে পেছনে ঠেলে কি গোটা সমাজটা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে এখন? জানিনা, তবে শহরে বেরোলেই খুব কষ্ট অনুভব করি এতগুলো পরিবারের দিনগুলো কাটছে কিভাবে তা ভেবে।

মন্তব্য করুনঃ